অভিনেতা পরিচয়ের বাইরে এক নতুন পরিচয়ে ধরা দিলেন নিলয় আলমগীর। ‎

নিলয় আলমগীর


অভিনয়ের জগতে নানা চরিত্রে দর্শকদের মুগ্ধ করেন । কখনো কোটিপতি, কখনো দিনমজুর—বৈচিত্র্যময় সব চরিত্রে পর্দায় হাজির হয়ে তিনি জয় করেছেন অসংখ্য দর্শকের ভালোবাসা। তবে একজন অভিনেতার পরিচয়ের আড়ালে যে একজন আন্তরিক, বিনয়ী ও মানবিক মানুষ লুকিয়ে আছেন, সেই দিকটি খুব কমই সামনে আসে। কাছ থেকে পরিচিত হওয়ার পর যেন সেই মানুষটিকেই নতুন করে আবিষ্কার করা গেল।


**যুক্তরাষ্ট্রের -এর একটি পার্ক। প্রতিদিনের মতো এখানকার বাসিন্দারা শরীরচর্চার জন্য সেখানে জড়ো হন। কয়েক মাস ধরে এই এলাকায় অবস্থান করায় নিলয় আলমগীরও নিয়মিত ওই পার্কে আসেন। শরীরচর্চার ফাঁকে নানা বিষয় নিয়ে আলাপচারিতার সুযোগ হয়। সেই সময়টুকুতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, পর্দায় যাকে আমরা একজন সফল অভিনেতা হিসেবে দেখি, বাস্তব জীবনে তিনি তার চেয়েও বেশি একজন বিনয়ী, আন্তরিক ও মানবিক মানুষ।


‎পশুপাখির প্রতি -এর গভীর মমতা ও অকৃত্রিম ভালোবাসা আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে। আলাপচারিতার একপর্যায়ে তিনি প্রাণীদের নিয়ে নিজের নানা অভিজ্ঞতা ও ভালোবাসার গল্প শোনান। তার প্রতিটি কথায় ফুটে ওঠে প্রাণীর প্রতি দায়বদ্ধতা, সহমর্মিতা এবং আন্তরিকতা। এসব গল্প শুনে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়।


তখনই মনে হলো, এই মানবিক দিকটি যদি মানুষের সামনে তুলে ধরা যায়, তবে হয়তো অনেকের মধ্যেই পশুপাখির প্রতি ভালোবাসা ও সহানুভূতির অনুভূতি জাগ্রত হবে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত নিলয় আলমগীরের নাটক দেখেন, তারা যদি তার এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রাণীদের প্রতি আরও সদয় হন, তবে তা শুধু প্রাণীদের জন্যই নয়, প্রকৃতি ও সমাজের জন্যও হবে একটি ইতিবাচক বার্তা।

নিলয় আলমগীর
নিলয় আলমগীর 


‎একদিন আলাপের একপর্যায়ে আমি তাকে বললাম, “বাংলাদেশে যেখানে মানুষের জীবনই অনেক সময় যথাযথ মূল্য পায় না, সামান্য কথা কাটাকাটিতেই মানুষ মানুষকে হত্যা করছে, একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও মানবিকতা যেন ক্রমেই কমে যাচ্ছে—সেখানে আপনি কীভাবে পশুপাখির প্রতি এত গভীর ভালোবাসা ও মমতার কথা ভাবেন?”


‎আমার প্রশ্নটি শুনে তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। এরপর শান্ত কণ্ঠে বললেন, “একটি বিষয় ভেবে দেখুন—একজন মানুষের হৃদয়ে যদি সামান্য হলেও পশুপাখির প্রতি মমতা থাকে, তবে তার পক্ষে আরেকজন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া অনেক বেশি কঠিন হয়ে যায়।”


তার কথার গভীরতা জানতে চাইলে তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, “যে মানুষ একটি প্রাণীর কষ্ট দেখে ব্যথিত হয়, যে নির্বাক কোনো জীবের যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে, তার হৃদয়ে সহানুভূতি জীবিত থাকে। আর যার ভেতরে সেই সহানুভূতি বেঁচে থাকে, তার পক্ষে অন্য একজন মানুষের প্রতি নির্মম হওয়া বা তার জীবন কেড়ে নেওয়া সহজ নয়।”


‎এরপর তিনি আমাকে একটি প্রশ্ন করলেন, যা আজও আমার মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। তিনি বললেন, “একবার ভেবে দেখুন, যে মানুষ একটি প্রাণীর সামান্য কষ্টও সহ্য করতে পারে না, তার পক্ষে কি আরেকজন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া সত্যিই সম্ভব?”


তার এই প্রশ্ন আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। আমরা অনেকেই পশুপ্রেমকে শুধু প্রাণীদের ভালোবাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখি। অথচ -এর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আরও বিস্তৃত ও গভীর। তার কাছে পশুপ্রেম মানে শুধু প্রাণীর প্রতি মমতা নয়; বরং প্রতিটি জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, দুর্বল ও অসহায় সত্তার প্রতি সহানুভূতি এবং সর্বোপরি মানবিক মূল্যবোধের চর্চা।

নিলয় আলমগীর


‎আমি আরও একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি—যে মানুষ ক্ষুধার্ত একটি কুকুরকে দেখে তাকে খাবার দিতে এগিয়ে আসে, আহত একটি বিড়ালকে দেখে থেমে যায় কিংবা কোনো নির্বাক প্রাণীর কষ্টে ব্যথিত হয়, সে স্বাভাবিকভাবেই একজন বেশি সংবেদনশীল মানুষে পরিণত হয়। আর এই সংবেদনশীলতাই তাকে অন্য মানুষের প্রতিও সহানুভূতিশীল, দয়ালু ও মানবিক হতে শেখায়।


বর্তমান সময়ে, যখন সমাজে সহিংসতা, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা ক্রমেই বাড়ছে, তখন -এর ভাবনাগুলো আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়। কারণ মানবিকতা কোনো একদিনে গড়ে ওঠে না; বরং ছোট ছোট মমতা, দয়া, সহানুভূতি এবং জীবের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের ধারাবাহিক চর্চার মধ্য দিয়েই একজন মানুষ প্রকৃত অর্থে মানবিক হয়ে ওঠে।


‎আমার কাছে  শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা নন; তিনি এমন একজন মানুষ, যার চিন্তা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। তার কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি, পশুপাখিকে ভালোবাসা কেবল প্রাণীর প্রতি মমতা প্রকাশ নয়; এটি মানুষের হৃদয়ে সহানুভূতি, দয়া এবং মানবিক মূল্যবোধকে লালন করার এক অনন্য উপায়। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণ নিরাপদে ও শান্তিতে বেঁচে থাকুক—এই কামনাই রইল।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url

Facebook